‘সব মরণ নয় সমান…’ এই পুরনো গানটাই কিছুদিন হল বারংবার শোনে সায়ন। কেন শোনে তা ঠিক জানে না। দিনবদলের যে স্বপ্ন তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়, তা খুঁজে চলে বিভিন্ন গল্প-কবিতা-গানে। কিন্তু হোস্টেলে এসব গান চালালেই বন্ধুরা টিটকারি করে। সেসব কথা যে খুব গায়ে মাখে তা নয়। এমনিতেই সে স্বল্পভাষী। অকারণ তর্ক-বিতর্ক এড়িয়েই চলে। অথচ স্কুল থেকেই বিভিন্ন ডিবেট কম্পিটিশনে তার প্রাইজ বাধা। সে ভাবে, এই অনিশ্চিত জীবনেও সবাই কত নিশ্চিন্তেই না আছে! কারও কোনও হেলদোল নেই! মাঝে মাঝেই অস্থির হয়ে ওঠে। কাউকেই কিছু বলতে পারে না। নিজের মধ্যে গুমড়ে মরে। তবু গুন গুন করে গেয়ে ওঠে, ‘অন্ধজনে দেহ আলো…’
হোস্টেলের হইহট্টগোলের মধ্যে সে যেন একটি নিঃসঙ্গ দ্বীপ। একমাত্র শুভ্রকেই সে সবকিছু শেয়ার করে। কারণ ও যে তার বাল্যবন্ধু। ক্যাম্পাসের বাইরে একটা মেসবাড়িতে থাকলেও, সে নিয়মিত আসে দেখা করতে, সময় কাটাতে। হোস্টেলের ঘরে এসেই সিগারেট ধরিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়াটা ওর অভ্যেস। মাঝে মাঝে রাতেও থেকে যায়। নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। রাজনীতি, অর্থনীতি, সাহিত্য, সিনেমা – সব কিছু। পড়াশোনাটা আছে ওর। বরাবরই ভালো ছাত্র। ফিজিক্সের বন্ধুটি এখন স্টুডেন্ট ইউনিয়নের সেক্রেটারি হওয়ায় প্রায় সব কথাতেই মিশে থাকে রাজনীতি। কখনও প্রচ্ছন্ন, কখনওবা প্রকট। তবে মূর্খের মত তর্ক করে না। মতের অমিল থাকলেও, একমাত্র ওর সাথেই কথা বলা যায়।
সেদিন হন্তদন্ত করে হোস্টেলের ঘরে এসে দরজার ছিটকানি দিতে দিতে বলল, ‘শুনলাম আন্ডারগ্রাউন্ড পলিটিক্যাল আইডিওলজির লোকজনের সাথে তোর বেশ ওঠাবসা! ওই জুরাসিক যুগের প্রাণীরা কেন আসে তোর কাছে ? চিনিস এঁদের ? এঁদের ওপর পুলিশের নজর আছে। তুইও কিন্তু বিপদে পড়বি। আমি কিন্তু প্রোটেকশন দিতে পারবো না। আর শোন, বাড়ির কথা ভেবেছিস একবার … কি ছাইপাশ সব গান শুনিস! তোর কি মনে হয় এ সব কথার আদৌ কোন অর্থ আছে ? শোন সব মরণই সমান। কারণ মরণটাই একমাত্র সত্য। এত গ্লোরিফাই করার কি আছে ? যারা এসব লেখে, গায় সবটাই ভড়ং। এরা মুখে সমাজ পাল্টানোর কথা বলে, আর ঠেলায় পড়লে অ্যাডজাস্ট করে। সব ব্যাটা ভন্ড।’
সায়ন সব শুনেও চুপ করে থাকে। জানে ও যখন বলা শুরু করে, বলতেই থাকে।
ভাষণ দেওয়ার মত শুভ্র বলে চলে, “তুই কি সত্যি মন থেকে বিশ্বাস করিস এ সব ? যে লাইনে চলছিস সেটা কি আদৌ ঠিক ? শোন বাস্তবতা বলেও তো কিছু থাকে রে। পৃথিবীটা পাল্টাচ্ছে দ্রুত। কেউ কি আটকাতে পারছে ? সবকিছুই নিজস্ব গতিতে চলছে। তুই, আমি কেউ কিস্যু করতে পারবো না। প্লিজ কল্পনার জগতে থাকিস না। এই হোস্টেলেই সবাই তোকে এড়িয়ে চলে। ভেবে দেখেছিস, কেন চলে? তুই কি মনে করিস চার-পাঁচটা লোক আন্ডারগ্রাউন্ডে থেকে সব কিছু পাল্টে দেবে? মনে করিস না, আমি নিহিলিস্ট। তোর মত আমিও স্বপ্ন দেখি- সব কিছুই পাল্টাবে একদিন। সেটা হবে প্রকৃতির নিজস্ব গতিপথেই। জোর করে কি কিছু হয়। তোরা যেভাবে ভাবছিস সেভাবে তো নয়ই।’
সায়ন কোন প্রত্যুত্তর না করে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে শুভ্রর দিকে। কখনও কখনও মনে হয়, ও যেন তার গার্ডিয়ান। একটা সিগারেট ধরিয়ে চুপচাপ কিছুক্ষণ থাকার পর চিন্তান্বিত মুখে দরজার ছিটকানি খুলতে খুলতে বলে, ‘এসব ফালতু বিষয় নিয়ে না ভেবে সিরিয়াসলি নেটের প্রিপারেশনটা শুরু কর। আর…’
কথাটা অসম্পূর্ণ রেখেই দ্রুত বেরিয়ে গেল।
২
দুদিন মাইগ্রেনের ব্যথায় হোস্টেল থেকে আর বেরোয়নি। নিজের সঙ্গে কাটাকুটি, সাপ লুডো খেলেছে। বারংবার প্রশ্ন করেছে – তবে কি সে ভুল ? বিশ্ব সংসারে তার চিন্তা ভাবনার কি কোন মূল্য নেই ? কে ঠিক – শুভ্র না সে ? আদর্শ ও বাস্তবতার দোলাচল তাকে যে এর আগেও ভাবায় নি তা নয়। প্রশ্নের পর প্রশ্ন মনের মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকে। শুভ্রর কথায় সারবত্তা নেই তা নয়, তবে ওই দাদারাও যখন এসে সমাজ পাল্টানোর কথা বলে, তা তখন অনেকে বেশি করে টানে। তাহলে কি এর মধ্যে আবেগটাই প্রধান ? শুভ্রর কথায়, ‘ও সব রোমান্টিসিজমের কোন মূল্যই নেই। এরজন্যে তো বারংবার খেসারত দিতে হয়েছে। কতগুলো মানুষ বেঘোরে প্রাণ দিয়েছে। যেন কিছুই না! সবই স্বাভাবিক! কারও মধ্যে এতটুকুও অনুতাপ নেই! যে বাড়ির মানুষ মরে, তাদের ওপর দিয়ে কি যায় তার খোঁজ কি কেউ রাখে?’ সায়ন বালিশে মুখ লুকায়। সামান্য আলোতেও ব্যথাটা তীব্র হয়ে ওঠে।
কতদিন হয়ে গেল বাড়িতে যাওয়া হয়নি। হোস্টেলে এসে প্রথম প্রথম প্রায়ই ছুটে যেত দুশো কিলোমিটার দূরের বাড়িতে। এখন তিন-চার মাসে একবারও যায় না। বাড়িতে গেলেই অস্থির লাগে। রিটেয়ারের পর বাবার শরীর দ্রুত ভাঙছে। বছর পেরোতে না পেরোতেই ধরা পড়েছে ডায়বেটিস, হাই প্রেসার আরও কত কিছু। বাবার একার ওপরেই সংসার। জানে তাঁর কিছু হলে সংসারটা ভেসে যাবে। তবু…
খুব সচ্ছলতা না থাকলেও, পড়াশোনার জন্য তিনি কখনোই কার্পণ্য করেননি নি। বাবা ছিলেন এসডিও অফিসের সামান্য ইউ ডি ক্লার্ক। কতইবা মায়না! তবু তা দিয়ে তাদের পড়াশোনা, সামাজিকতা রক্ষা করা, ছোট মত একটা বাড়ি বানানো – কোন দায়িত্বই উপেক্ষা করেননি। এখনও পেনশনের টাকা দিয়েই হোস্টেলে রেখে তাকে পড়ানো, বোনের কলেজ সবকিছুই চলছে। বাবা এক জগতের মানুষ। সারাটা জীবন কৃচ্ছসাধন করেও একটা ঘর জুড়ে লাইব্রেরী করেছেন। আগে লেখালেখিরও অভ্যেস থাকলেও, এখন নেই। রিটেয়ারের পর বই কেনা প্রায় বন্ধই। মুখে না বললেও, তাঁর সেই কষ্টটা বোঝে সায়ন। অবসন্ন শরীর নিয়েই বইয়ের ওপর জমে থাকা ধুলো পরিষ্কার করে যান নিয়ম করে। সারাটা দিন কাটিয়ে দেন ওই বইঘরেই। ওটাই তাঁর ভূবন। একদিন বলেছিলেন, ‘ তোদের জন্যে তো আর টাকাপয়সা রেখে যেতে পারবো না। এই লাইব্রেরীটাই রেখে যাব। যত্ন করিস।’
বাবার অসহায় চেহারার দিকে আজকাল তাকাতে ভয় হয়। হোস্টেল থেকে একারণেই সে বাড়ি যেতে চায় না। বোনটারও তো বিয়ে দিতে হবে! কিছু না বললেও সে বোঝে, সবাই যেন তার মুখ চেয়ে বসে আছে। মাঝে মাঝেই ভেবেছে, সংসারের হাল না ধরে সমাজ পাল্টানোর মিছিলে হাঁটা কি ঠিক? এসকেপিজম নয় তো ? শুভ্র কি সেদিন সেকথাই বলতে এসেছিল…
৩
ডিপার্টমেন্টের তিন তলা থেকে সিড়ি দিয়ে নামতে নামতে রূপসা তাকে প্রায় ধরেই ফেলে। ওরও ডিপার্টমেন্ট একই ফ্লোরে। অন্য সময় হলে অপেক্ষা করত। এমনিতে ক্লাস শেষ হলে দুজনে ক্যান্টিনে বা কোথাও গিয়ে বসে।
- ‘কি রে একা একা কোথায় যাচ্ছিস ?’
- ‘লাইব্রেরীতে। স্যার ক্লাসে কতগুলো বইয়ের কথা বললেন…’
- ‘চল আমিও যাবো। আচ্ছা তোর ব্যাপার কি ?’
- ‘কেন কিছু না তো!’
- ‘দুদিন হল ডিপার্টমেন্টেও আসিস নি …’
- না তেমন কিছুনা।
- ‘কিছু তো একটা হয়েছে। লুকোচ্ছিস।’
দুপাশে গাছগাছালির নিবিড় আলিঙ্গনে সায়ন চুপচাপ হেঁটে যায় রূপসার সাথে। এমন নয় যে আজ নতুন করে ওরা এপথে হাঁটছে। বহুবার হেঁটে গেছে…
রূপসা একদিন স্বগতোক্তির মত করে বলেছিল, ‘এপথ ভালোবাসার – হারিয়ে যাওয়ার…’
ইউনিভার্সিটিতে তাদের আয়ু আর মেরেকেটে মাস ছয়েক। ফাইনাল পরীক্ষার পর সবাই কে কোথায় চলে যাবে ! তখন কে কার খোঁজ রাখে… এভাবে কত সম্পর্কই না ভেঙে যায়! রূপসাকে সে অনেক বুঝিয়েছে। তার এই অনিশ্চিত জীবনের সাথে কিছুতেই জড়াতে চায় নি ওকে। কিন্তু মেয়েটা কোন কথাই শোনে না। বড্ড অবুঝ। উল্টে একদিন বলেছিল, ‘তুই একা টেনশন করছিস কেন… আমিও চেষ্টা করব। একজনের কিছু একটা জুটে গেলেই তো হল!’
লাইব্রেরীর উত্তর কোণের ফাঁকা টেবিলে দুজনে গিয়ে বসে। বইয়ের রিকুইজিশন স্লিপ কাউন্টারে দিয়ে সায়ন আবার ফিরে আসে। রূপসা কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকার পর বলে, ‘গতকাল শুভ্র এসেছিল।’
-‘কেন ?’
-‘ সত্যি বলতে তোর জন্যে ও খুব চিন্তায় আছে।’
-‘ কেন ? আর ওর সাথে তো কথাই হল দুদিন আগে। নিশ্চয়ই তোকেও বিস্তর জ্ঞান দিয়েছে… ওর যা স্বভাব!’
-‘জ্ঞান দেবে কেন… শুধু বলে গেল, তুই একটু ওকে বোঝা। সায়ন ভুল পথে হাঁটছে। খুব বিপদে পড়বে। এত ইমোশনাল হলে চলে… ’
সায়ন কিছু না বলে লাইব্রেরীর ভাঙা কাঁচের জানলা দিয়ে দূরে তাকিয়ে থাকে। মেঘলা আকাশে পলাশ ফুলের আগুন ঝরা ক্যানভাস। কয়েকটা পাখি এ ডাল – ও ডাল করে খেলা করে যাচ্ছে। কখনও দূরে চলে যায়, আবার ফিরেও আসে। গাছগুলোতেই বোধহয় ওদের ঘর-সংসার। তাই দূরে চলে গেলেও, বারংবার এই ফিরে আসা…
ভেবে পায় না, রূপসাকে সে ঠিক কি বলবে? ওরও তো জানা দরকার! কিন্তু…কোথাও যেন আটকাচ্ছে। একবার ভাবে, যা সবাইকে খুলে বলা যায় না, তা কি আদৌ ঠিক পথ…
যাহোক বেশি ভেবে লাভ নেই। যেকথা একদিন না একদিন বলতেই হবে, তা বলে ফেললেই তো ল্যাটা চুকে যায়। কিন্তু কি ভাবে বলবে? শুরুটাই বা করবে কোথা থেকে ?
নীরবতা ভাঙে রূপসাই।
-‘যা বই চলে এসেছে। নিয়ে আয়।’
৪
আজ যেন সে এক অন্য রূপসাকে দেখছে। অনেক গম্ভীর, অনেক পরিণত। স্বাভাবিক চঞ্চলতা উধাও। কাউন্টার থেকে বই দুটো নিয়ে এসে দেখে, যাওয়ার জন্য সে-ই আগে থেকেই দাঁড়িয়ে আছে সিড়ির কাছে।
রাস্তায় নেমে কোন রাখঢাক না রেখেই বলে, ‘ এরমধ্যে তোর কাছে করা এসেছিল রে ? এঁদের পরিচয়টা ঠিক কি ?’
বলবে না, বলবে না করেও সায়ন বলেই দেয়, ‘ হ্যাঁ এটা ঠিক যে ওরা আন্ডারগ্রাউন্ড পলিটিক্স করে। কিন্তু এই পচেগলে যাওয়া সমাজটা পাল্টানোর স্বপ্ন ওরাই একমাত্র দেখে। সত্যি বলতে আমি ওদের আইডিওলজির সাথে নিজেকে রিলেট করতে পারি। শুভ্রদের সাথে কোনভাবেই নয়।’
সায়ন এক নি:শ্বাসে কথাগুলো বলে যেন হালকা বোধ করে। আজ বড্ড গুমোট চারদিক। আকাশেরও মুখ ভার।
রূপসা তার কথা শোনার পরেও যেন ভাবলেশহীন। আজ সে কথা বলছে মেপে মেপে। যে অনর্গল কথা বলে যায় তার হঠাৎ এই পরিবর্তন!
বলে, ‘ চল ক্যাম্পাসের বাইরে। বড় রাস্তায়। একটু নিঃশ্বাস নেওয়া যাবে।’
-‘বৃষ্টি কিন্তু নামবে। ছাতা এনেছিস ?’
সায়নকে আড়চোখে একবার দেখে এবার হেসেই ফেলে রূপসা।
– ‘তুই তাহলে বৃষ্টির ভয় পাচ্ছিস! ভালো!’
সায়ন বোঝে এর মধ্যে সূক্ষ্ম খোঁচা আছে। কথা না বাড়িয়ে হোস্টেলে যাওয়ার রাস্তাটায় না গিয়ে সোজা এগিয়ে যায় বড় রাস্তার দিকে।
এদিকটা বেশ নির্জন। ভিসি, রেজিস্টারদের কোয়ার্টার। সেসব পেরিয়ে ইউনিভার্সিটির মেইন গেটের কাছে আসতেই শুরু হয়ে যায় মুসলধারে বৃষ্টি। আশেপাশে এমন কোন শেডও নেই যে গিয়ে দাড়াবে। দুজনেই ভিজে যেতে থাকে…
সায়ন এবার কিছুটা রাগত স্বরেই বলে, ‘তুই কি কিছুই শুনবি না! বললাম, ছাতা নেই। বৃষ্টি নামবে। শুনলি না। এখন ভিজে তো এখন জ্বর বাধাবি।’
-‘হলে হবে। কথা না শোনা তো তোর কাছ থেকেই শিখেছি।’
-‘খোঁচা দিচ্ছিস ?’
-‘একেবারেই না। তবে আমারও একটা কথা বলার আছে…’
সায়ন বড় রাস্তার দিকে আর না গিয়ে বলে, ‘চল ফিরে যাই। চুপচুপে ভিজে গেছিস। এভাবে বোকার মত ভিজে ভিজে হাঁটতে থাকলে লোকে তোকে পাগল বলেই, আমাকেও বলবে।’
বৃষ্টির দাপট কিছুটা কমে এল। অন্ধকার হয়ে আসা নির্জন বৃষ্টি ভেজা পথে ওরা দুজন যেন পথ হারানো পথিক। তবু পৌঁছাতেই হবে। অর্ধেক পথ তখনও বাকি। সায়নের মনে পড়ে সেই গানের পংক্তি – ‘আমাদের যেতে হবে দূরে বহু দূরে…’
ধীর পায়ে হাঁটতে হাঁটতেই রূপসা আবার তোলে প্রসঙ্গটা।
-‘তুই কি আন্ডারগ্রাউন্ড পলিটিক্সে সম্পূর্ণ ঢুকে গেছিস ? আমার কাছে একদম লুকাবি না।’
-‘জানিস ওদের মধ্যে একজন আই.আই.টি-র এক অধ্যাপক আছেন। কি সুন্দর করে কথা বলেন। অত সুন্দর কেরিয়ার ছেড়ে…।
-‘আবার কিন্তু এড়িয়ে যাচ্ছিস। শোন বলতে না চাইলে সোজাসুজি সেটাই বল।’
- ‘ আচ্ছা যন্ত্রণা তো! তোরা কি কিছুতেই বুঝবি না… শুভ্রর মত তুইও শুরু করেছিস!’
- ‘ শোন এরপর ওরা এলে আমার সাথে পরিচয় করিয়ে দিস।’
-‘কেন?’
-‘বাহ্! তুই এত কিছু বুঝিস সিম্পল এটা বুঝলি না…’
-‘না বুঝি নি। তুই কি ওদের সাথে ঝগড়া করবি ? ’
-‘কেন ঝগড়া করব ? তোর লোকজন বলে কথা! ভাবছি, আমিও তোর পথই বেছে নেবো। কি বলিস ? দুজনে একসাথে বেশ রাজনীতি করা যাবে। অ্যাটলিস্ট একসাথে তো থাকতে পারবো…’
-‘তোর কি মাথা খারাপ হয়েছে ?’
-‘এরমধ্যে মাথা খারাপের কি দেখলি ? ’
-‘তুই কিছুই জানিস না। এসব হল অভিমুন্যের চক্রব্যুহ। ঢুকলে বেরোনোর কোন পথ নেই।’
-‘ আচ্ছা সত্যি করে বল তো, তুইও কি সেই চক্রব্যুহের মধ্যে ঢুকে গেছিস ? যদি ঢুকেই থাকিস, তাহলে আমিই বা বাদ থাকি কেন ?’
-‘বড্ড অবুঝ হচ্ছিস। এটা কোন জেদের বিষয় নয়। আমি জেনে বুঝে তোকে বিপদের মধ্যে ঠেলে দিতে পারবো না। আমাদের রাজনীতি তো আর শুভ্রদের মত ক্ষমতা দখলের নয়, সমাজ পাল্টানোর…’
-‘বাহ্ বাহ্ বেশ তো! তুই আমাকে বিপদে ফেলবি না, কিন্তু নিজেকে … এটা হিপোক্রেসি হয়ে গেল না ?’
-‘কিসের হিপোক্রেসি ?’
-‘যে আদর্শের জন্য সবকিছু জলাঞ্জলি দিচ্ছিস, সেই আদর্শে আর একজন আসতে চাইছে- আর তাকে বাধা দিচ্ছিস!’
-‘তুই বুঝতে পারছিস না।’
-‘শোন আমাদের কথার কোন মূল্যই তোর কাছে নেই জানি, কিন্তু তুই কি নিশ্চিত যে তোরা সবকিছু পাল্টাতে পারবি… সব কিছু কি আদৌ পাল্টানো যায় ? সবার আগে তো প্রয়োজন মানুষের মন পাল্টানো। সেটা পারবি তো ? না কি তোরাও মত চাপিয়ে দেওয়ার রাজনীতি করবি… জোরজবরদস্তি করে কি কিছু টেকে ?’
একসাথে এত প্রশ্নবাণ ছুটে আসায় সায়ন দিশেহারা হয়ে যায়। সব প্রশ্নের তো আর উত্তর হয় না, দেওয়াও যায় না। তবে আজ সত্যিই রূপসা তাকে এমন অনেক প্রশ্নের সামনে দাড় করিয়েছে, যা আগে সে ভেবেই দেখেনি। বৃষ্টিস্নাত এই গার্গীর দিকে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে। যুগে যুগে গার্গীরা জন্মায় যাজ্ঞবল্কদের কঠিন প্রশ্নবাণে বিদ্ধ করতে। এরা প্রশ্ন তোলে সিস্টেম থেকে থিওরী সবকিছুর। সায়ন ভেবে পায় না রূপসারই বা এই উত্তর খোঁজার এত ব্যাকুলতা কেন ? তাকে আটকানোর জন্যে, না কি সে নিজেও সবকিছু পরখ করে নিতে চাইছে?
তার সবকিছুই গুলিয়ে যেতে থাকে। তাহলে কি তার চিন্তা ভাবনার মধ্যেও ফাঁক থেকে গেছে? এতদিন তো সেসব তলিয়ে ভাবে নি।
সন্ধ্যা নামার আগেই নিকষ অন্ধকারে ঢেকে গেছে চারপাশ। চেনা পথ, তবু অচেনা ঠেকছে। আবারও মুষলধারে বৃষ্টি নেমেছে। সায়ন বলে ওঠে, ‘পা চালা তাড়াতাড়ি। এখনও অনেকটা পথ যেতে হবে…’
………………. রাজর্ষি বিশ্বাস